জেলা 

৮৫ বছর বয়সে বিদায় নিলেন প্ৰখ্যাত শিল্পী ও বিদগ্ধ পন্ডিত আব্দুল হাই মিস্ত্রি

শেয়ার করুন

এস এম শামসুদ্দিন : হাওড়া জেলার উনসানি গ্রামের তথা হাওড়া জেলার প্ৰখ্যাত শিল্পী ও ইসলামী শাস্ত্রের বিদগ্ধ পন্ডিত আব্দুল হাই মিস্ত্রি গতকাল সকালে উনসানি গ্রামে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর জানাজার নামাজ আসর বাদ অনুষ্ঠিত হয়, উনসানি গ্রামের তাঁদের পারিবারিক কবরস্থানে তাঁর মরাদেহ সমাহিত করা হয়। বাংলার প্ৰখ্যাত আলেম ও পাঁশকুডা দারুল উলুম মাদ্রাসার শায়খুল হাদিস মাওলানা আজিজুল হক কাসেমি সাহেব তাঁর আত্মার শান্তির জন্য দুআ করেন এবং অগাধ পাণ্ডিত্যের কথা বলতে গিয়ে বলেন আব্দুল হাই মিস্ত্রি সাহেব ছিলেন একজন চলমান লাইব্রেরি, আমি আমার লেখা একধিক বই লেখার সময়ে কোনও তথ্য জানতে চাইলে তিনি তৎক্ষণাৎ বইয়ের অনুচ্ছেদ সহ বলে দিতেন।

আব্দুল হাই মিস্ত্রি সাহেব উনসানি গ্রামের রেডিমেড পোশাক শিল্প প্রধান পরিবেশ ও পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।এবং পারিবারিক সূত্রেই তিনি পোশাক শিল্পের একজন নিপুন দক্ষ শিল্পী হিসেবে নিজেকে প্রস্তুত করেন এবং কলকাতার নিউ মার্কেট সংলগ্ন স্থান হার্ড ফোর্ড লেনে *নিউ আর্ট সেন্টার*, আব্দুল হাই মিস্ত্রি সাহেব এমন একজন বিরল প্রতিভার ব্যতিক্রমী দক্ষ কারিগর ছিলেন যে তাঁর শিল্প দক্ষতায় মুগ্ধ বহু বিখ্যাত ব্যক্তিরা তাঁর কাছে আসতেন। রিলায়েন্স গোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠাতা ধীরুভাই আম্বানির স্ত্রী কোকিলা বেন কলকাতায় পা রাখলে তিনি এসে আব্দুল হাই মিস্ত্রির সঙ্গে দেখা করতেন শুধু নয় তাঁর হাতের তৈরী পোশাক নিতেন। এ ছাড়াও ৪ নম্বর হার্ড ফোর্ড লেনে তাঁর কাছে আসতেন বহু বিখ্যাত শিল্পীগণ।

উস্তাদ আমজাদ আলী খাঁন তাঁর হাতের তৈরী পাঞ্জাবী পরে অনুষ্ঠান করতে যেতেন। এছাড়া বাংলা চলচিত্রের একদা বিখ্যাত নায়িকা সন্ধ্যা রায় , হিন্দি ছায়াছবির নায়িকা শশিকলা গুজরাটি ঘাকরারুপোর নিপুন হাতের কাজের ঘাগরা নিতে আসতেন। আব্দুল হাই মিস্ত্রি সাহেবের হাতে তৈরী পাঞ্জাবী সৌভাগ্য বহন করে এনে বলে মনে করতেন বিখ্যাত গজল গায়ক অনুপ জালোটা,। আব্দুল হাই সাহেব শুধু মাত্র হাতের কারুকার্যের জন্য বিখ্যাত ছিলেন না তাঁর হাতের তৈরী ছবি আঁকায় এক উজ্জ্বল ব্যতিক্রমী ভাবনা ছিল। বাংলার বিখ্যাত চিত্র পরিচালক সত্যজিৎ রায় ছিলেন তাঁর ছবির গুনমুগ্ধ। সত্যজিৎ রায়ের “জলসা ঘর ও চারুলতা, ছায়া ছবিতে তাঁর হাতে আঁকা ছবি তে তাঁকে কো আর্টিস্ট হিসেবে কাজ করিয়েছেন। এবং জলসাঘর ছবিতে তাঁর জমিদার বাবুর জরির তৈরী জুতা টি আব্দুল হাই মিস্ত্রির হাতের তৈরী। সত্যজিৎ রায় বলেছিলেন আব্দুল হাই সাহেব যদি ছবিতে মনোনিবেশ করেন তিনি অনেকদূর যাবেন। কিন্তু এমন একজন বিরল প্রতিভার শিল্পী ছবি আঁকা থেকে এমন সুযোগ পেয়েও মুখ ফিরিয়ে আনেন শুধুমাত্র বাবা পছন্দ করতেন না পুত্র আব্দুল হাই ছবি আঁকুন।

এর্নপর থেকে সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে আর যোগাযোগ রাখেন নি। শুধুমাত্র জীবনজীবিকার কারণে পোশাক শিল্পে যুক্ত থাকলেও তাঁর জ্ঞান সাধনার প্রতি আকর্ষণ ছিল প্রবল। তিনি বাংলা, উর্দু, আরবি, পারসী, ও ইংরেজি ভাষায় বিশেষ জ্ঞানের অধিকারী এক জ্ঞান সাধক ছিলেন। এবং প্ৰখ্যাত আলেম ও পন্ডিত দের সাথে তাঁর নিবিড় সংযোগ ছিল। তাঁর নিউ আর্ট সেন্টারে আনাগোনা ছিল বহু বিশিষ্ট আলেম ও জ্ঞানী গুণী পন্ডিত ব্যক্তিদের। বসিরহাটের পীর আল্লামা মাওলানা রুহুল আমীন সাহেব তাঁর উনসানির বাড়িতে আসতেন। এ ছাড়াও বাংলার প্ৰখ্যাত আলেম মওলানা তাহের সাহেব। পাণ্ডুয়ার পীর মৌলানা ওহিদুদ্দিন সাহেব। মৌলানা আব্দুল আহাদ রহ সাহেব, কবি ও সাহিত্যিক আব্দুল্লাহ সাদী সাহওব সহ বহু প্ৰখ্যাত ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে সংযোগ রক্ষা ও ইসলামী শিক্ষা ও বিষয়ে আড্ডা বসত তাঁর আর্ট সেন্টারে। বই পোকা, হিসেব তিনি বাংলার জ্ঞানী ও পন্ডিত মহলে বিশেষ পরিচিতি লাভ করেন । জীবন জীবিকার প্রয়োজনে যতটুকু তাঁর আয়ের প্রয়োজন ততটুকু ছাড়া তিনি সংগ্রহ করতেন বহু বিখ্যাত বই। তিনি শিক্ষাগত যোগ্যতার নিরিখে ডিগ্রি অর্জন না করলেও তাঁর নিরলস জ্ঞান সাধনা ও চর্চার জন্য তিনি আয়ের একটা বিশাল অংশই ব্যয় করতেন পুস্তক কেনার জন্য।

১০০ থেকে দেড়শ বছরের ওরচীন বই তাঁর নিজস্ব লাইব্রেরিতে। এম এন রায়ের লেখা The histrical role of islam বইয়ের অনুবাদক ছিলেন তিনি। বইটি কলকাতার মল্লিক ব্রাদার্স থেকে প্রকাশিত হয় এবং এই বইটি বাংলাদেশ বুলবুল সরোয়ার প্রকাশ করেন। এ ছাড়াও তিনি বহু উর্দু ও আরবি, বইয়ের অনুবাদক ছিলেন। বাংলার বহু প্ৰখ্যাত আলেম তাঁর শুরুণাপন্ন হতেন। দেশ ভাগের আগে পরে বিহু প্রাচীন পত্র পত্রিকা তাঁর লাইব্রেরিতে সংগ্রহে। তিনি নানান গুরুত্বপূর্ণ বিষিয়ে তথ্যভিত্তিক আলোচনা ও পর্যালোচনা মূলক প্রবন্ধ নিবন্ধ লিখেছেন।

আমার পারিবারিক আত্মীয় হওয়ার সূত্রে এমন একজন বিরল প্রতিভার ব্যক্তিত্ব কাছাকাছি যাওয়ার সুযোগ পেয়ে নানান বিষয়ে আলোচনা করার সুযোগ পেয়েছি বহুবার। স্ত্রী বিয়োগ হয়েছে কয়েকবছর আগেই, চার পুত্র ও তিন কন্যা নিয়ে ছিল তাঁর ত্যাগ ও সাধনাময় আদৰ্শ জীবন। এমন একজন বিরল শিল্পী, জ্ঞান সাধক ও আদৰ্শ আলমে দ্বিন এর প্রয়ানে সমাজ হারাল তাঁর এক অভিভাবক কে। যা অপূরণীয় ক্ষতি।


শেয়ার করুন

সম্পর্কিত নিবন্ধ